1. live@dailypurbavas24.com : news online : news online
  2. info@dailypurbavas24.com : দৈনিক পূর্বাভাস :
বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:১৯ পূর্বাহ্ন

ইরান ইস্যু: তথ্যযুদ্ধ, বিভ্রান্তি ও বাস্তবতা

প্রতিবেদকের নাম:
  • প্রকাশিত: বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬
  • ২৫৮ বার পড়া হয়েছে

শামসুর রহমান
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি নতুন করে সংঘাত-উত্তপ্ত হলেই একটি চেনা দৃশ্য সামনে আসে। তা হলো- তথ্যের চেয়ে দ্রুত ছড়ায় অপতথ্য। বিশ্লেষণের আগে তৈরি হয় পক্ষ-বিপক্ষ অবস্থান। আর প্রকৃত সত্যের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় অপপ্রচার-প্রচারণা, গুজব আর ভিত্তিহীন সংবাদ পরিবেশনা। সাম্প্রতিক সময়েও ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের মধ্যেকার যুদ্ধ ঘিরে এমনই এক তথ্যযুদ্ধ চলছে। যেখানে একটি সরলীকৃত বয়ান বারবার বিশ্ববাসীর সামনে আনা হচ্ছে- ইরান নাকি সৌদি আরবে হামলা চালিয়ে ‘ধর্মীয় সীমা লঙ্ঘন’ করেছে। বলা হচ্ছে- মুসলমানদের শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মভূমি সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মুসলিম দেশে ইরান হামলা করে গুরুতর অপরাধ করেছে। সীমা লঙ্ঘন করেছে। আসল সত্য হলো- ইরান সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে হামলা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে। আর এসব মার্কিন ঘাঁটির মূল উদ্দেশ্যই হলো- যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম শাসকদের দুনিয়াবি লোভ-লালসায় ডুবিয়ে রেখে তাদের দেশের প্রচুর অর্থ-সম্পদ নিজেদের দেশে নিয়ে যায়। ইরান এক্ষেত্রে ব্যাতিক্রম। ইরান ইহুদিবাদী রাষ্ট্র ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। যেখানে পশ্চিমাদের প্রেসক্রিপশনে চলে না। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইহুদি ও পশ্চিমাদের আদর্শে বিশ্বাসীরা দুনিয়াবি স্বার্থে ইরানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তারা ইরানের বিরুদ্ধে মিথ্যা বানোয়াট তথ্য দাঁড় করিয়ে বলছে মুসলমানদের মধ্যে ঐক্যেফাটল ধরাচ্ছে। ইরান ইসলামের শত্রু। ইরানী জাতি শিয়া সম্প্রদায়। শিয়ারা মুসলিম নয়। ওরা কাফের। ইত্যাদি…।
মুসলামনদের মধ্যে বিভক্ত, অনৈক্য সৃষ্টি করতে ইসলামী জীবনব্যবস্থায় শিয়া ও সুন্নী আদৌও মুখ্য কোনো কারণ নেই। ইরানীরা এক আল্লাহ, শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ওপর বিশ্বাসী। আল্লাহর মহাগ্রন্থ কোরআন ও নবী মুহাম্মদ (সা.) এর হাদিস অনুসরণ করেন। নামাজ পড়েন। রোজা রাখেন। হজ করেন। যাকাত দেন। আল্লাহর একাত্ববাদে পূর্ণ বিশ্বাসী কাউকে কাফের বলাটা ইসলাম সমর্থন করে না।
ইসলামের মূলধারার পণ্ডিতগণ মনে করেন, ইরানীদের কাফের বলাটা শয়তানি চক্রের সঙ্গে জোটবদ্ধ মুখোশধারী ইসলামপন্থী দালালদের কাজ। আল্লাহর একত্ববাদ ও নবী করীম (সা.)-এর আদর্শে বিশ্বাসীকে একজন মুসলমান হিসেবে ভালোবাসা, সমর্থন করা, তাঁর বিপদে পাশে থাকাই প্রকৃত ঈমানদার ব্যক্তির পরিচয় বহন করে। ইরান বিরোধী ইহুদিবাদী ও পশ্চিমাদের মদতপুষ্টরা এই সত্য মানতে নারাজ। ইরানের বিরুদ্ধে অযৌক্তিক ও অন্যায্য এবং প্রথম হামলা চালিয়ে ইহুদিবাদী ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র ইতিহাসের যে ঘৃণ্যতম অপরাধ করেছে এ বিষয়টি তাদের হৃদয়ে দাগ কাটেনি। এর অর্থ হলো- ইসলামের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টিতে দুনিয়াবির লোভে মুখোশধারী ইসলামপন্থীরাই ইহুদিবাদী ও পশ্চিমাদের চর!
যে প্রশ্নগুলো বিশ্লেষ করা জরুরি
প্রথমত. মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো সামরিক ঘটনার ক্ষেত্রে ‘‘কোথায় আঘাত হয়েছে। এ প্রশ্নের পাশাপাশি ‘কেন’, কী প্রেক্ষাপটে এবং কাকে লক্ষ্য করে” আঘাত করা হয়েছে। এ প্রশ্নগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ দিয়ে বিশ্লেষণ করা উচিত। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে বারবার উঠে এসেছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তৃত সামরিক উপস্থিতি একটি বড় ‘ফ্যাক্টর’। সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটি, প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং সামরিক সহযোগিতা- সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য যেন দীর্ঘদিন ধরেই বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতার কেন্দ্র। এ প্রেক্ষাপটে কোনো হামলা যদি সামরিক স্থাপনা বা কৌশলগত ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হয়ে থাকে, সেটিকে সরাসরি ‘ধর্মীয় আক্রমণ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা কতটা যৌক্তিক? সেটি নিয়েও স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে। অথচ, তথ্যের এ সূক্ষ্ম পার্থক্যটিই অনেক ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে আড়াল করা হচ্ছে। লক্ষ্য একটিই, ইসলাম ধর্মকে আক্রমণ করে সহজ-সরল এবং আবেগপ্রবণ বয়ান তৈরি করা যায়।
দ্বিতীয়ত. মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। কেউ এটিকে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার অংশ হিসেবে দেখেন, আবার অনেকে মনে করেন- এটি মূলত ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার কৌশল মাত্র। তেলসমৃদ্ধ এই অঞ্চলে সামরিক ঘাঁটির অবস্থান। অস্ত্রচুক্তি এবং রাজনৈতিক প্রভাব সৃষ্টি করাই মূল লক্ষ্য। যার নেপথ্যে মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিশীলতা রাখতে একটি জটিল শক্তির সমীকরণ কাজ করে। এ বাস্তবতায় ইরান নিজেকে একটি ভিন্নধর্মী রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করেছে। যে রাষ্ট্র পশ্চিমা-নীতির সরাসরি অনুসারী নয়। আঞ্চলিক রাজনীতিতে নিজস্ব এবং স্বাধীন অবস্থান ধরে রাখতে চায়। এ অবস্থানই ইরানকে কিছু মানুষের কাছে প্রতিরোধের প্রতীক বানিয়েছে। আবার অনেকের কাছে রাষ্ট্রটিকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ শক্তি’ হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা চলছে।
তৃতীয়ত. সবচেয়ে স্পর্শকাতর যে বিষয়টি সামনে আনা হয়, সেটি হলো ধর্মীয় বিভাজন ‘শিয়া বনাম সুন্নি’। এই বিভাজনকে ব্যবহার করে প্রায়ই রাজনৈতিক বক্তব্যকে ধর্মীয় রূপ দেওয়া হয়। অথচ ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের জায়গায় শিয়া ও সুন্নি উভয় সম্প্রদায়ই এক আল্লাহ, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এবং পবিত্র কোরআনে বিশ্বাসী। মতপার্থক্য রয়েছে- সেই পার্থক্যকে কেন্দ্র করে কাউকে ‘ইসলামের শত্রু’ বা ‘কাফের’ ঘোষণা করা ইসলামের মূল চেতনার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে ইসলামি চিন্তাবিদদের মধ্যেও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। মূলধারার ইসলামি পণ্ডিতরা শিয়া ও সুন্নি ইস্যুতে বিভাজনের পক্ষে নয়। আর এখানেই মূল প্রশ্নটি উঠে আসে। তাহলে কী- মুখোশধারী ইসলামপন্থীরা ধর্মীয় পরিচয়কে ব্যবহার করে ইসলামের বিপক্ষ শক্তিকে শক্তিশালী করতে সংঘাতকে উসকে দিতে চায়?
চতুর্থত. বর্তমান বিশ্বে তথ্যযুদ্ধ একটি বাস্তব ও শক্তিশালী অস্ত্র। রাষ্ট্র, মিডিয়া, স্বার্থগোষ্ঠী- সকলেই নিজেদের বয়ান প্রতিষ্ঠার জন্য তথ্যকে ব্যবহার করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এ প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও ব্যাপক করে তুলেছে। যে কারণে একটি অসম্পূর্ণ তথ্য। একটি কাটছাঁট করা ভিডিও। কিংবা প্রেক্ষাপটহীন একটি বক্তব্য। মুহূর্তেই ‘সত্য’ হিসেবে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
ইরান ইস্যুতে আমরা সেই চিত্রই দেখছি। একপক্ষ ইরানকে সম্পূর্ণভাবে আগ্রাসী হিসেবে তুলে ধরছে। অন্যপক্ষ আবার ইরানকে নিখুঁত প্রতিরোধের প্রতীক বানাচ্ছে। বাস্তবতা সম্ভবত এ দুই মেরুর মাঝামাঝি কোথাও। যেখানে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা, কৌশল, আদর্শ এবং রাজনীতি সবকিছু একসঙ্গে বিবেচ্য বিষয়।
পঞ্চমত. ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ইস্যুতে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- প্রথম আঘাত, প্রতিক্রিয়া এবং দায় নির্ধারণের প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রায়ই দেখা যায়, কে আগে আঘাত করেছে এবং কেন করেছে। এ প্রশ্নগুলোই সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত, আলোচিত-সমালোচিত হয়। বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের অবস্থানকে ন্যায্য প্রমাণ করতে আলাদা আলাদা ব্যাখ্যাও দিয়ে থাকে। ফলে ‘আক্রমণ’ এবং ‘প্রতিরক্ষা’ এ দু’টি শব্দের মধ্যকার পার্থক্যও অনেক সময় রাজনৈতিক বড় ফ্যাক্ট হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে নিরপেক্ষভাবে তথ্য-যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। কোনো ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র না জেনে শুধু আবেগ বা পক্ষপাতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বিভ্রান্তি বাড়ায়, সমাধান নয়। একটি মৌলিক বিষয় আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন- মধ্যপ্রাচ্যের এ সংঘাত কেবল ধর্মীয় নয়, কেবল সামরিকও নয়। এটি একটি বহুমাত্রিক সংকট। যেখানে জড়িত আছে ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি, শক্তির ভারসাম্য এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতি।
মোদ্দা কথা, একজন সচেতন বিবেকবান মানুষ হিসেবে দায়িত্ব হলো- তথ্যকে যাচাই করা। প্রেক্ষাপট বোঝা। বিভ্রান্তিকর বয়ানের বাইরে গিয়ে সত্যের কাছাকাছি পৌঁছানোর চেষ্টা করা। কারণ একটি ভুল ব্যাখ্যা শুধু মতামতকে প্রভাবিত করে না। বরং, পুরো একটি অঞ্চলের মানুষের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকেও বিকৃত করে দিতে পারে। ইরান, সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা অন্য কোনো রাষ্ট্র- কাউকেই অন্ধ সমর্থন বা অন্ধ বিরোধিতার মাধ্যমে বোঝা সম্ভব নয়। প্রয়োজন বিশ্লেষণ। প্রয়োজন সতর্কতা। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা।
লেখক: সাংবাদিক
২৫.০৩.২৬

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন
© www.dailypurbavas24.com